ওয়ারলেস ক্যাম্পে পাক হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় কাশিয়ানীবাসীদের

muktijoddha.org : ’৭১ এর স্বাধীনতাযুদ্ধ কালীন সময়ে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি চিহ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাটিয়াপাড়ার ওয়ারলেস ক্যাম্পটি। এ ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নিরীহ বাঙ্গীল ওপর চলে নির্মম অত্যাচার ও নারীদের ওপর চলে পাশবিক নির্যাতন। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও ওয়ারলেস ক্যাম্পটি এসব স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় কাশিয়ানীবাসীকে ।

কাশিয়ানী উপজেলার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশার মোল্যা, আজিজুর রহমান, হানিফ মাহমুদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালো রাত থেকে দেশব্যাপী হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু হলেও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে হানাদারবাহিনী আসে ৭ এপ্রিল। এদিন রাজাকার ছলেমান সর্দারের নেতৃত্বে ফরিদপুর থেকে রেল গাড়িতে করে মধুখালী বোয়ালমারী হয়ে কাশিয়ানীর রেলস্টেশনে নামে হানাদার বাহিনী। হানাদার বাহিনীদের স্বাগত জানাতে রাজাকার মজি, খলিল ও খোকা মৌলভীসহ ৩০/৩৫ জন রাজাকার কাশিয়ানী রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছিল। পাকবাহিনী আসার সাথে সাথে তাদের স্বাগত জানিয়ে কাশিয়ানী হাইস্কুল ভবনে নিয়ে আসে এবং পরে সেখানেই ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই দিন রাতে মালা গ্রামে প্রবেশ করে তারা বেশ কয়েকটি বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। দুই দিন কাশিয়ানী থাকার পর হানাদার বাহিনী ভাটিয়াপাড়া ওয়ারলেস অফিসে গিয়ে ঘাঁটি তৈরি করে, শেষে স্থানীয় রাজাকার, আলবদরদের নিয়ে মিটিং করে। ভাটিয়াপাড়া মোতালেব মিয়ার বিল্ডিং এ স্থানীয় রাজাকার মজি, খলিল, খোকা মৌলভী তাদের নিরাপদ ঘাঁটি তৈরি করে।

এরপর শুরু করে অপারেশন, প্রথমই তারা মধুমতি নদীর পাড়ে চরভাট পাড়া গ্রামের কাপালী পাড়াতে প্রবেশ করে সমস্ত হিন্দুবাড়ী জ্বালিয়ে দেয় এবং যুবতীদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এসময় তারা অভিমান্য কাপালী নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করে। অভিমান্য কাপালীর দুই ছেলে অনিল ও অধির মাঠে জমির কাজ করছিল। বাবার মৃত্যুর কথা শুনে পাগলপ্রায় হয়ে বাড়ির দিকে ছুটে আসার সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের একজনকে আক্রমণ করে, তার রাইফেল কেড়ে নিয়ে যায়। যাবার আগে অনিল তার দুটি চোখ উপড়ে ফেলে। ফলে ওই পাক সেনাটি মারা যায়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে অনিলের পায়ে একটি গুলি লেগে যায়। অনিল আহত অবস্থায় কোনমতে পালিয়ে যায়।

পরের দিন হানাদার বাহিনীরা ভাটিয়াপাড়া এলাকার সকল রাজাকারদের নির্দেশ দেয় অনিল কাপালীকে জীবিত বা মৃত ক্যাম্পে হাজির করতে হবে। হাজির না করলে এ এলাকার সব গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর স্থানীয় রাজাকারদের নির্দেশে তৎকালীন ভাটিয়াপাড়া হাই স্কুলের মৌলভী শিক্ষক আঃ রউফ মিয়া লোকজন নিয়ে অনিল কাপালীর বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের কাছে অনিলের চিকিৎসার কথা বলে তাকে এনে ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পে হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। অনিলকে হানাদার বাহিনীরা জবাই করে তার মাংস টুকরো টুকরো করে চরভাটপাড়া খালে ভাসিয়ে দেয়।
এছাড়া এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা নিরীহ লোকজন ও যুবতী নারীদের ধরে এনে সারাদিন নির্যাতন করার পর সন্ধ্যায় ভাটিয়াপাড়া রেলস্টেশনের পাশে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায় এবং হত্যা করে মাটি চাপা দেয়।সেই সাথে অনেকের লাশ খালে ফেলে দেয়। ভাটিয়াপাড়াসহ কাশিয়ানী উপজেলার বিভিন্নস্থানে হত্যাযজ্ঞের অনেক নীরব সাক্ষী রয়েছে যা কাশিয়ানীবাসীকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। অনেকে আবার এ স্মৃতি মনে করে ভয়ে শিউরে ওঠে এখনও।